সরকার পতন না করে রাজপথ ছাড়বে না ২০ দল।

আসছে উৎকণ্ঠার জানুয়ারি। এক বছর আগে ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল সহিংসতা। দেশে এখন মোটামুটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। ২০ দল পুরো একটি বছর বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। সব ব্যর্থতা ও হতাশা ঝেড়ে ফেলে তারা আগামী জানুয়ারিতে সরকার পতনের দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে চায়। ১৪ দলও প্রস্তুত দাবি আদায় না করে রাজপথ ছাড়বে না ২০ দল।
নতুন বছরের শুরুতেই নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে নামবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। সর্বোচ্চ ঝুঁকির মুখেও এবার দাবি আদায় না করে ঘরে না-ফেরার ঘোষণা বারবার দিয়েছেন জোটনেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ শীর্ষ নেতারা। খালেদা জিয়া সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করে চলেছেন। আন্দোলনের 'রোডম্যাপ' প্রণয়নের কাজও সম্পন্ন। আগামী ৩ ও ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশের কর্মসূচি দেবে জোট।

শিগগির দলীয় ফোরামে কর্মসূচি বিষয়ে আলোচনা করে তা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। গতকাল সোমবার বিকেলে দু'দিনের সমাবেশের জন্য রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও নয়াপল্টন এলাকা ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে আবেদন করেছে বিএনপি। সমাবেশের অনুমতি না দিলে টানা ৭২ ঘণ্টা হরতালের ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে হরতালের পর টানা অবরোধ-অসহযোগের মতো কর্মসূচির চিন্তাভাবনাও করছেন বিএনপি হাইকমান্ড।

সূত্র জানায়, ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিনটিকে 'গণতন্ত্র হত্যা' এবং 'কালো দিবস' হিসেবে পালন করবে বিএনপি। ওই দিন আওয়ামী লীগ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করায় ৩ জানুয়ারি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, হত্যা-গুম বন্ধ ও গ্যাস-বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর দাবিতে রাজধানীতে একটি সমাবেশ করবে বিএনপি। তবে ৫ জানুয়ারি 'একতরফা' নির্বাচনের এক বছর পূর্তির দিনটিকে 'কালো দিবস' হিসেবে রাজধানীতে বড় ধরনের সমাবেশ ও কালো পতাকা মিছিলের মাধ্যমে ব্যাপক শোডাউন করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর গাজীপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ করতে না দিলে প্রতিবাদে অন্য কর্মসূচি দিতে পারেন তারা।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সমকালকে বলেন, একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন বর্তমান অবৈধ সরকারকে এক বছর সময় দেওয়া হয়েছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে দ্রুত সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে আসছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। সরকার তাতে কর্ণপাত না করে স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনা করছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে আমাদের আন্দোলন চলছে। শিগগির নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। কোন ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে_ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারের আচরণের ওপর কর্মসূচির ধরন নির্ভর করবে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত শনিবার ঢাকা মহানগরের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ৩ ও ৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশ করার ব্যাপারে একমত পোষণ করা হয়। এর পর রোববার রাতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার বাসভবনে বৈঠক করেন তারা। কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়া না হলে পরিস্থিতি অনুযায়ী লাগাতার হরতালসহ কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান খালেদা জিয়া।

রাজধানীতে আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ঢাকার প্রতিটি থানায় সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হচ্ছে। গতকাল ২০ দলীয় জোটের ঢাকা মহানগর নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। ২০ দলীয় এই জোটের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয় রেখে ঢাকা মহানগরে আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে এ কমিটি। আজ মঙ্গলবার থেকেই শুরু হবে এই সংগ্রাম কমিটি গঠনের কাজ। ঢাকা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভা পরিচালনা করেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। সভায় ২০ দলীয় জোটের বিভিন্ন দলের ঢাকা মহানগর সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা অংশ নেন।

বৈঠক সূত্র জানায়, বৈঠকের পর থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জোট শরিক দলগুলোর থানা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নাম ও যোগাযোগের ঠিকানা, ফোন নম্বরসহ বিএনপির দপ্তরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। থানা নেতাদের মধ্যে সমন্বয় করে গঠন করা হবে ২০ দলীয় সংগ্রাম কমিটি। আগামী তিন-চার দিনের মধ্যে মহানগর নেতাদের পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে এ কমিটিগুলো। বৈঠকে জোট নেতারা যে কোনো পরিস্থিতিতে রাজপথে থাকার অঙ্গীকার করেন।

সূত্র জানায়, সমাবেশগুলোর ভেন্যু হিসেবে বিএনপি রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি চাইবে। একই সঙ্গে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কের অনুমতিও চাওয়া হবে।বিএনপির দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে রয়েছে সমাবেশ ছাড়াই শুধু কালো পতাকা মিছিল। সে ক্ষেত্রে সমাবেশ না থাকায় এ বিক্ষোভ মিছিলের ব্যাপ্তি হবে বড় রকমের। এ ধরনের মিছিল জঙ্গিমিছিলে রূপ নিতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের আশঙ্কাও করছেন বিএনপি হাইকমান্ড।

সূত্র জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজেই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা দিতে পারেন। আবার চেয়ারপারসনের পরিবর্তে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এ হরতালের ঘোষণা দিতে পারেন। এবারের হরতালকালে নেতাকর্মীদের রাজপথে থাকা 'অবশ্যকর্তব্য' বলে জানিয়ে দেবেন হাইকমান্ড।

সরকারকে দাবি আদায়ে বাধ্য করতে ঢাকার সঙ্গে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হতে পারে। বিশেষ করে সড়ক ও নৌপথ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতে চাইবে দলটি। খালেদা জিয়া নিজেই মহানগর ও ৭৫টি সাংগঠনিক জেলা ও থানা পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। ২০ দলীয় জোটের বাইরে থাকা কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও বিএনপি যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। এরই মধ্যে আগামী দিনে রাজপথে আন্দোলন করতে সক্ষম এমন নেতাদের একটি তালিকা তৈরির কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে।

সুত্রঃ দৈনিক সমকাল।

Comments